চোখে ভাসে ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’

hangor-nodi-grenedeমুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক চলচ্চিত্রের কথা বলা হলেই আমাদের মনে যে নামগুলো ভেসে ওঠে- হাঙ্গর নদী গ্রেনেড তার মধ্যে নেই। ওরা ১১ জন, আলোর মিছিল, আগুনের পরশমনি; এ কালজয়ী ছবিগুলোর মাঝে কেন যেন হারিয়ে যায় ‘হাঙ্গর নদী গ্রেনেড’। তা যাক, কিন্তু কখনও যদি জানতে ইচ্ছে করে সেই মায়ের কথা, যিনি দেশের জন্য সন্তানকে বিসর্জন দিতে পারেন, এ আত্মত্যাগ কতটুকু স্বার্থহীন হতে পারেন তাহলে দেখতে হবে ‘হাঙ্গর নদী গ্রেনেড’।

‘হাঙ্গর নদী গ্রেনেড’ মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ সন্তানহারা মায়ের প্রতিচ্ছবি। সেলিনা হোসেনের একই নামের উপন্যাসের চলচ্চিত্ররূপ ‘হাঙ্গর নদী গ্রেনেড’। চলচ্চিত্রটি পরিচালনা, শিল্প নির্দেশনা ও চিত্রনাট্য করেছেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম। অভিনয়ে আছেন সুচরিতা, সোহেল রানা, অরুণা বিশ্বাস ও আরো অনেকে। পরিচালক নিজেও আছেন অতিথি চরিত্রে! সংলাপ রচনা করেছেন লেখিকা সেলিনা হোসেন স্বয়ং। গান লিখেছেন মুন্সী ওয়াদুদ ও সুর করেছেন শেখ সাদী খান। বাংলাদেশ সরকারের অনুদানে নির্মিত চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায় ১৯৯৫ সালে।

গল্পের দৃশ্যপট হলদী গাঁ আর সে গাঁয়ের এককালের দস্যি মেয়ে বুড়ী, যদিও বুড়ী নামটা তার একদমই পছন্দ না। তার বিয়ে হয় বয়সে অনেক বড় চাচাত ভাই গফুরের সঙ্গে। বুড়ী সবার থেকে একটু আলাদা, সে চায় হলদী গাঁয়ের বৃত্ত থেকে বের হতে, নতুন কিছু দেখতে। চাচাত ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ের ফলে রাতারাতি বুড়ী মা হয়ে যায় গফুরের আগের পক্ষের দুই ছেলে সলিম ও কলিমের। দিন যায়, বুড়ীর কোলে আসে নতুন সন্তান রইস। কিন্তু সে তো আর দশটা শিশুর মত নয়! অনেক দিনের আকাঙ্ক্ষার সন্তানের অসহায়ত্ব সঙ্গী হয় তার, রইস হয়ে দাঁড়ায় অপরিহার্য।

দিন যায়, ছেলেরা বড় হয়। বিয়ে করে, সংসার পাতে। ভাবছেন, তাই তো হবেই! অজপাড়াগায়ে আর কি হবে? হয়ত তাই হতো, জীবন গড়িয়ে যেত। কিন্তু সময়কাল যে ১৯৭১! সারাদেশের স্বাধীনতার উন্মাদনার আঁচ লেগেছে এই ছোট্ট গাঁয়েও। ভাবছেন, তা লাগল। তাতে কি হয়েছে? সেই আঁচ এই ছোট্ট পরিবারটিকে তছনছ করে দেয়। কিভাবে?

suchotira-hangor-nodi-grenedeহাফেজ ও কাদের দুই মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধ করতে করতে শত্রুপক্ষের চোখ ফাঁকি দিয়ে আশ্রয় নেয় বুড়ীর ঘরে। পিছু পিছু হানাদাররাও বাড়িতে আসে। এ সময়ই আসে হয় ইতিহাসের ভিন্ন এক মুহূর্ত। বুড়ি একজন মা। সে প্রতিটি মুহূর্তে তার সন্তানদের জন্য আতংকিত। দেশপ্রেমের অগ্নিপরীক্ষায় একজন মা, মুক্তিযোদ্ধাদের বাঁচাতে নাড়িছেঁড়া সন্তানকে তুলে দেয় বন্দুকের নলের মুখে। যখন তাকে দিতে হয় চরম পরীক্ষা, সে বেছে নেয় তার দেশ, তার মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের।

বুড়ী তখন আর শুধু রইসের মা হতে পারে না। সে তখন পুরো বাংলার মা। সকল মুক্তিরযোদ্ধার মা যাকে শুধু তার পেটে ধরা সন্তানের কথা ভাবলে চলবে না। চরিত্রটি নিঃসন্দেহে কঠিন ছিল, কিন্তু সুচরিতা চমৎকার মানিয়ে নিয়েছেন নিজেকে। সোহেল রানার নিজের চরিত্রটি রুপায়নে সহজাত মুন্সীয়ানা ছিল। বাকি যারা অভিনয় করেছেন, সকলেই নিজ নিজ সেরাটা দিয়েছেন।

হৃদয়বিদারক শেষ ভাগের কথা না বললেই নয়! চোখে পানি ধরে রাখা অসম্ভব ছবির শেষ দৃশ্যে। বুড়ীর কান্না সেই লক্ষ্য মায়ের কান্নারই প্রতিনিধিত্ব করে, যাদের রক্তের বিনিময়ে আমরা আজ স্বাধীন।

হয়ত হাঙ্গর নদী গ্রেনেড কোন মাস্টারপিস নয়। হয়ত দক্ষ চোখে ধরা পড়বে হাজারো ত্রুটি। কিন্তু ১৯৭১ সালে সন্তানহারা মা বুড়ীর কান্না আমাদেরকে বারবার মনে করিয়ে দিবে এক সাগর রক্তে আমরা পেয়েছিলাম স্বাধীনতা। মনে থাকবে সেই হাঙ্গরদের কথা, যারা আমাদের নদীতে আমাদেরই নির্বিচারে হত্যা করেছিল। সেই গ্রেনেড তুল্য ছেলেরা, যারা নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে আমাদের জন্য রেখে গেছে স্বাধীনতা।

হাঙ্গর নদী গ্রেনেড (১৯৯৭)
চিত্রনাট্য ও পরিচালনা : চাষী নজরুল ইসলাম
প্রযোজনা : চাষী চলচ্চিত্র
কাহিনী : সেলিনা হোসেন
চিত্রগ্রহণ : জেড এইচ মিন্টু
সঙ্গীত : শেখ সাদী খান
সম্পাদনা : সৈয়দ মুরাদ
অভিনয়ে : সুচরিতা, সোহেল রানা, ইমরান, অরুণা, দোদুল, রাজীব, মিজু আহমেদ প্রমুখ।

মন্তব্য করুন।

মন্তব্য করুন