রোজিনা

আশি ও নব্বই দশকের বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেত্রীর নাম রোজিনা। টানা চোখের অপরূপ সুন্দরী এই নায়িকার পর্দায় উপস্থিতি মানেই মিষ্টি হাসিতে দর্শকের মন ভুলানো অভিনয়। চলচ্চিত্র থেকে বিদায় নিয়ে বর্তমানে লন্ডনপ্রবাসী এই জনপ্রিয় নায়িকা। বছরান্তে দেশে ফিরে ছোট খাটো শ্যুটিং এ অংশ নিলেও চলচ্চিত্রে কাজ করেন না গুণী এই অভিনেত্রী।

ছোটবেলা থেকেই চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহী ছিলেন রোজিনা। বাড়ির পাশে চিত্রা সিনেমাহলে নিয়মিত সিনেমা দেখতেন তিনি। এই সিনেমার নেশা তাকে পড়াশোনা থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। ১৯৭৬ সালে জানোয়ার ছবিতে পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। ঢাকার পুরাতন সংসদ ভবন এলাকায় জানোয়ার ছবির শ্যুটিং চলছিল। নায়িকা শর্বরী সে ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। শ্যূটিং দেখতে আসা রোজিনাকে সে সময় একটি পাসিং শটে অভিনয়ের জন্য ডেকে নেয়া হয়। তার অভিনীত দৃশ্যটি ছিল একটি ট্রে-তে বোতল এবং কিছু গ্লাস সাজিয়ে টেবিলে পৌছে দেয়া। এ কাজটুকু করার জন্য তাকে দশ টাকা সম্মানী দেয়া হয়েছিল।

১৯৭৭ সালে ফখরুল আলম পরিচালিত ছবি সাগর ভাসা-তে নায়িকা হিসেবে অভিনয়ের কথা থাকলেও শ্যুটিং সেটে গিয়ে রোজিনা নায়িকা হিসেবে কবরীকে দেখতে পান। এতে তিনি কষ্ট পেয়ে ছবিটির শ্যুটিং করা থেকে বিরত থাকেন। পরবর্তীতে তিনি এফ কবীর পরিচালিত রাজমহল সিনেমায় তিনি একক নায়িকা হিসেবে প্রথম অভিনয় করেছিলেন। তখনো তিনি রোজিনা নামে পরিচিত হন নি। রোজিনা নামে খ্যাতি পাওয়ার আগে তার নাম ছিল রেনু, রওশন আরা, শায়লা। আয়না ছবিতে তিনি শায়লা নামে অভিনয় করেন। মি্টু আমার নাম ছবিতে তিনি প্রথম রোজিনা নামে হাজির হন। এ সময় তিনি জন্মনিয়ন্ত্রন পিল মায়া বড়ির বিজ্ঞাপনের মডেল হয়ে বেশ আলোচিত হন। বিজ্ঞাপনটি বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শন করা হত।

১৯৮৬ সালে পাকিস্তানে ‘হাম দো হায়’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য পাকিস্তানের ‘নিগার এ্যাওয়ার্ড’ লাভ করে ভারতীয় উপ-মহাদেশে চমক সৃষ্টি করেন এবং বাংলাদেশের জন্য সুনাম বয়ে নিয়ে আসেন। রোজিনা তৎকালীন ভারতের জনপ্রিয় নায়ক মিঠুন, পাকিস্তানের জনপ্রিয় নায়ক নাদিমসহ ভারতীয় উপমহাদেশের বিখ্যাত বহু অভিনেতার বিপরীতে নায়িকা হিসাবে অভিনয় করেছেন। অভিনয়ের জন্য চিত্রনায়িকা রোজিনা ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশ হতে ছোট বড় প্রায় ১৫ টি অন্তর্জাতিক পুরষ্কার লাভ করে নজির সৃষ্টি করেন। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তার অভিনিত ছবির সংখ্যা দাড়ায় ২৫৫টি। ১৯৯০ সালের পর তিনি কোলকাতায় পাড়ি জমান এবং সেখানে প্রায় ২০ টি সফল ছবিতে নায়িকা হিসাবে অভিনয় করেন। ২০০৫ সালে রাক্ষুসী চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশী চলচ্চিত্রে অভিনয়ের ইতি টানেন এই নায়িকা।

১৯৮০ সালে রোজিনা ‘কসাই’ ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৮৮ সালে ‘জীবনধারা’ ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান রোজিনা। রোজিনার গালে যে তিলটির জন্য তাকে চমৎকার হিসেবে উপস্থাপন করে সেটি নকল তিল। বাস্তবে তার কোন তিল নেই।

রোজিনা রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দে নানা বাড়িতে জন্মগ্রহন করেন। শিশু ও কৈশোর সময়টা কেটেছে নিজ বাড়ি রাজবাড়ি শহরেই। তার পিতা দলিল উদ্দিন এবং মা খোদেজা বেগম। দলিল উদ্দিন ছিলেন একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।রোজিনারা মোট চার বোন ও দুই ভাই। তার পারিবারিক বা প্রকৃত নাম ‘রেনু’।

চলচ্চিত্র বিষয়ক লেখক লিয়াকত হোসেন খোকন তার সম্পর্কে লিখেন, ‘রোজিনা যখন নায়িকা তখন ঢাকার সিংহভাগ ছবিই ভারতের হিন্দি ছবির কাহিনীর আদলে তৈরি হতো। যে জন্য হিন্দি ছবির কোনো কোনো নায়িকার অভিনয় তাকে ফলো করতে হয়েছে বার বার। তা সত্ত্বেও রোজিনা তার নায়িকা জীবনে বহু দর্শকের মনে রেখাপাত করতে পেরেছিলেন। কারও-বা চোখে তিনি ছিলেন মন-ময়ূরী।’ তবে বিবিসির সাথে এক সাক্ষাতকারে রোজিনা এ বিষয়টি অস্বীকার করেন।

চলচ্চিত্রে আগমনের আগেই বিয়ে করেছিলেন রোজিনা। পরবর্তীতে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন চলচ্চিত্র প্রযোজক ফজলুর রশিদ ঢালীকে। তিনি মারা যাওয়ার পর ১৯৯৫ সালে প্রবাসী এক বাংলাদেশীকে বিয়ে করে প্রবাসে স্থায়ী হয়েছেন রোজিনা।

 

 

ব্যক্তিগত তথ্যাবলি

পুরো নাম রওশন আরা রেণু
ডাকনাম রোজিনা
জন্মস্থান গোয়ালন্দ, রাজবাড়ি।

অন্যান্য ব্যক্তি