জাকিয়া বারী মম

জাকিয়া বারী মম (Zakia Bari Momo) একজন নৃত্যশিল্পী এবং অভিনেত্রী। মূলত টিভি নাটকে অভিনয় করলেও তিনি প্রথম চলচ্চিত্রে অভিনয় করেই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতে সবার মনযোগ আকর্ষন করেন।

মম মিডিয়ায় আসেন লাক্স চ্যানেল আই সুপারস্টার প্রতিযোগিতার মাধ্যমে। অভিনয়ের অনেক আগে থেকেই নৃত্যশিল্পী মম। ১৯৯৫ সালে নতুন কুঁড়ি পুরস্কার জিতেছেন নৃত্যের জন্য। পড়াশোনা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে। অনার্স এবং মাস্টার্স দুটো শ্রেণিতেই তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হবার গৌরব অর্জন করেন।

পরিবারের সহায়তায় সাংস্কৃতিক চর্চার দিকে মনযোগি হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। মা আয়েশা আক্তারের সাথে মফস্বল থেকে ঢাকায় আসতেন নাচ শিখতে, এ কারণে অনেক কটুকথা শুনতে হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানের সাফল্যে সবাই প্রশংসা করেন – এমনটিই জানিয়েছিলেন মম। নাচ শিখেছেন কবিরুল ইসলাম রতনের কাছে, আবৃত্তি শিখেছেন বাবা মজিবুল বারীর কাছে। ব্রাক্ষ্মনবাড়িয়ার আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গনে নাচ গান শিখেছেন বলে তার বর্তমান অবস্থানের পেছনে তাদের অবদানের কথাও কৃতজ্ঞতার সাথে স্বীকার করেন মম।

তৌকির আহমেদ পরিচালিত দারুচিনি দ্বীপ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পর মম বেশ কিছু টিভি নাটক ও টেলিফিল্মে অভিনয় করেন। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য টিভি নির্মানের মধ্যে রয়েছে স্বর্ণমায়া, বিবর, নীড় ইত্যাদি। মম মনে করেন অভিনেত্রী হিসেবে তার টার্নিং পয়েন্ট হল নীড় নাটক, এই নাটকের আয়শা চরিত্রটি দর্শকদের সাথে তাকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তিনি ‘ভালোবাসার চতুষ্কোণ’ নাটকের শীর্ষ সংগীতে অপূর্বর সঙ্গে কণ্ঠও দিয়েছেন।

নিজের পোশাক এবং আনুষঙ্গিক সংক্রান্ত পছন্দের কথা বলতে গিয়ে এক সাক্ষাতকারে মম জানান – ‘আমার প্রিয় পোশাক শাড়ি। শাড়ি পরতে ভালো লাগে। তবে আরামদায়ক লাগে পাঞ্জাবি আর জিনস। সময় এবং উৎসব বুঝে এক এক ধরনের শাড়ি পরি। শাড়ির ক্ষেত্রে গোলাপি এবং বেগুনি রং প্রিয়। সুতির পোশাক ভালো লাগে। দেশি ফ্যাশন হাউসের মধ্যে রং, আলতামিরা, শাহরুখ কালেকশন্সের পোশাক পরি। অনুষঙ্গের মধ্যে তো অনেক কিছুই পরে। চুড়ি, ক্লিপ, সানগ্লাস, ঘড়ি।’

২০১০ সালের ৩১ মার্চ তারিখে মম বিয়ে করেন জনপ্রিয় নাট্যনির্মাতা এজাজ মুন্নাকে। ২০১১ সালের ২রা মার্চ তারিখে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিত্সক সামিনা বেগমের তত্ত্বাবধানে সফল অস্ত্রপাচারে মম-মুন্নার পরিবারে একটি পুত্র সন্তান জন্ম নেয়, তার নাম রাখা হয় উদ্ভাস। তবে ২০১৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে এজাজ মুন্নার সংসারে টানাপোড়েন চলছে বলে সংবাদের শিরোনাম হন মম। এসময় নাট্যনির্মাতা শিহাব শাহিনকে জড়িয়ে বিভিন্ন সংবাদ পরিবেশিত হয়।

২০১৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর তারিখে মম আত্মহত্যার চেষ্টা করে স্কয়ার হাসপাতালের ১৩০৭ নম্বর কেবিনে চিকিৎসাধীন থাকার সংবাদ প্রকাশিত হয়। স্কয়ার হাসপাতালের তথ্য কর্মকর্তা হ্যানি গোমেজের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, মম নিউরোমেডিসিন সেকশনে ভর্তি আছেন। ডা. আব্দুল কাদের শেখের অধীনে তার চিকিৎসা চলছে।  দাম্পত্য টানাপোড়েনে অস্থির মম বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন বলে জানা গেলেও মম পরবর্তীতে তীব্রভাবে অস্বীকার করেন। তার ক্যারিয়ার প্রতি ষড়যন্ত্র এবং তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার দাবী করে মম সংবাদমাধ্যমে জানান ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর যথেষ্ট বিশ্রাম না নেয়ায় শ্যুটিং স্পটে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং হাসপাতালে ভর্তি হন। অন্যদিকে এর আগে মম’র স্বামী এবং চিকিৎসক আত্মহত্যার চেষ্টার সত্যতা জানিয়ে মত প্রকাশ করেছিলেন।

আত্মহত্যা চেষ্টার অল্প কিছুদিন আগেই মিডিয়ার সহকর্মীদের সম্পর্কে বেফাঁস মন্তব্য করে আলোচনার জন্ম দেন মম। ঢাকারিপোর্ট২৪ ডট কম নামের অনলাইন সংবাদ মাধ্যমে প্রদত্ত সাক্ষাতকারে মম সুন্দরী প্রতিযোগিতা, মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার এবং মিডিয়ার শিল্পী-কলাকুশলীদের তীব্র আক্রমন করেন। মম নিজেও সুন্দরী প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মিডিয়ায় আসলেও এই প্রতিযোগিতা সম্পর্কে বলেন, ‘পৃথিবীব্যাপী সুন্দরী প্রতিযোগিতা হচ্ছে একটা ব্যবসা। মেয়েরা হচ্ছে ব্যবসার উপকরণ। ছোট কাপড়ের মেয়েরা ব্যবসার ভাল উপকরণ, আর বড় কাপড়ের মেয়েরা ব্যবসার অপেক্ষাকৃত কম উপকরণ। আমি নিশ্চয় বিষয়টা বুঝাতে পেরেছি। তাই সুন্দরী প্রতিযোগিতা শুধু ব্যবসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এর চেয়ে বেশি কিছু না। সুন্দরী হতে হলে যে শুধুমাত্র গড গিফটেড চেহারা, সুন্দর চোখ নিয়েই আসতে হবে তা নয়। সুন্দরী হলো মেধা, বুদ্ধি ও শিক্ষার সমন্বয়।’

মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার সম্পর্কে মম বলেন, ‘দলীয়করণ আর নোংরামির ভেতরে সবাই ডুবে গেছে। প্রথম আলো পুরস্কার মানেই জয়া আহসান, প্রথম আলো পুরস্কার মানেই ফারুকী, মোশারফ করিম। তারাই কিন্তু শুধু অ্যাক্টর নয়, তারা এতই অবাঞ্ছিত অভিনয় করেন যে সেটা নেওয়ার মতো না। তাহলে তারা কিভাবে বেস্ট অ্যাওয়ার্ড পান। মুখে কালি মেখে অভিনয় করে যদি বেস্ট অ্যাওয়ার্ড পাওয়া যায়, তাহলে তো রাস্তার একটা ছেলেও অভিনয় করবে, হচ্ছেও তাই।’

নাটকের মান নিয়েও খেদ প্রকাশ করেন মম। তিনি বলেন,  ‘বর্তমানে চ্যানেল বেশি, কম্পিটিশন বেশি, কিন্তু এই কম্পিটিশন সুস্থ কম্পিটিশন না, অসুস্থ কম্পিটিশন। কম বাজেটে কিভাবে অথর্ব ডিরেক্টর দিয়ে, অযোগ্য ক্রু দিয়ে, অযোগ্য আর্টিস্ট দিয়ে কম দামে বানিয়ে কিভাবে বেশি দামে নাটক সেল করা যায় এটাই হচ্ছে চ্যানেল মালিকদের উদ্দেশ্য। ভাল উদ্দেশ্যের ঘাটতি থাকলে প্রোডাক্টের কোয়ালিটি এমনই হবে।’ পরিচালকদের সাথে কাজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে সিনিয়র জুনিয়র মিলিয়ে আর্টিস্ট আছে ধরেন ৫০ জন আর ডিরেক্টর আছে ৪০০ জন। তার মধ্যে আলু, পটল, ভেংরি, কোমড়া প্রতিদিনই গজাচ্ছে। যে কিছুই পারে না সে প্রোডাকশনে কাজ করে আর যে নিজেকে তার চেয়ে আরেকটু বেটার মনে করে সে হচ্ছে ডিরেক্টর। আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে বাংলাদেশে প্রচুর ডিরেক্টরের মধ্যে ভাল ডিরেক্টর পাবেন হাতেগোনা দশজনকে। কিন্তু তারা একটা কাজ করতে গিয়ে এতই খরচ করে যে, প্রডিউসার ভেগে যায়। তাহলে আমরা বড় নামজাদা ডিরেক্টরদের কাছ থেকেই বা কি আশা করতে পারি।’

মিডিয়ায় তারই সহকর্মীদের প্রসঙ্গেও নিন্দা করেন মম। অভিনেতাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের অধিকাংশ আর্টিস্টের প্রপার শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই। যেমন ধরেন তিশা কিন্তু লেখাপড়া কমপ্লিট করে নাই। কোথাকার কোন টেলিকমিউনিকেশনে পড়তো, আজীবন পড়েই যাচ্ছে। বিন্দু জাহাঙ্গীর নগর থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে। মীম জাহাঙ্গীরনগরে আমার ডিপার্টমেন্টেই পড়তো। পরপর দুইবার ফেল করায় বহিষ্কৃত হয়েছে। শুধু তারা নয় খোঁজ নিলে দেখা যাবে, ম্যাক্সিমাম আর্টিস্টেরই এই অবস্থা।’

পরবর্তীতে সহকর্মীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে বেফাঁস মন্তব্য করার কারণ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে আজকেরবাংলাদেশ২৪ নামের অনলাইন সংবাদ মাধ্যমে দেয়া সাক্ষাতকারে তার মন্তব্যের ব্যাপারে স্বীকৃতি দিয়ে মম বলেন, ‘তিশা, বিদ্যা সিনহা মীম, বিন্দু, অপু বিশ্বাস নিয়ে যা বলেছি সত্যি বলেছি। যা সত্যি তাই তো বলব। এই দেশে তো ডেমোক্রেসি নেই। আমি ডেমোক্রেসির কথা বলি। সত্য কথা বলতে হবে। সবার বলতে শেখা উচিত সত্য কথা। আর সত্য কেউ বলে না বলেই দেশের এই অবস্থা। আমি তো কোনোটা মিথ্যে বলিনি।’ পরবর্তীতে অবশ্য বিদ্যা সিনহা মীম সংবাদমাধ্যমে মম’র বক্তব্যবে পুরোপুরি মিথ্যা বলে দাবী করেন।

নিজেকে পরিপূর্ণ অভিনেত্রী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার লক্ষ্য নিয়ে মম এভাবেই পথ চলছেন।

 

উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র

ব্যক্তিগত তথ্যাবলি

পুরো নাম জাকিয়া বারী মম
ডাকনাম মম
জন্ম তারিখ আগস্ট ১৪, ১৯৮৪
জন্মস্থান বাহরামপুর, ঢাকা।

পুরষ্কার

পুরষ্কার বছর ফলাফল বিভাগ/গ্রহীতা চলচ্চিত্র
জয়ী শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী দারুচিনি দ্বীপ