নিরন্তর : যে বাস্তব শেষ হয় না

জীবনে পতিতা-র সাথে কখনো কথা বলেছেন?

তখন অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়ি। ঢাকা থেকে ক্লাস করি। ক্যাম্পাসের বাসে ছিল আসা-যাওয়া। একদিন আমার ফ্রেন্ডসহ জরুরি কাজ শেষ করে ঢাবি টিএসসি থেকে ফিরছি। ফেরার পথে যে দেরি হয়ে গেছে অনেক তা জানতাম না। আমার হাতঘড়িটা সমস্যা করছিল। ফ্রেন্ডকে বললাম ‘কটা বাজেরে।’ ও বলল ‘রাত প্রায় এগারোটা।’ ভয় পেয়ে গেলাম খানিকটা। ও ছিল খুব সাহসী। ঘরে-বাইরে তেমন কাউকে পরোয়া করত না। স্বাধীন ছিল খুব। তো আমরা গাড়িঘোড়াও পাচ্ছিলাম না। ওর মিরপুর যাওয়া দরকার আমার শ্যামলী। হেঁটেই রওনা দিলাম। আসাদ গেটের যে রাস্তাটা সংসদ ভবন হয়ে খামারবাড়ি গেল সেখানে মোড়ে আসতেই কয়েকটা মহিলাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। Continue reading

দীপু নাম্বার টু : কৈশোরের অ্যাডভেঞ্চার

ছেলেবেলায় দেখা আপনার সেরা দেশীয় সিনেমা কোনটি?

প্রশ্নের উত্তরে যে সিনেমাগুলোর নাম মিলবে তার মধ্যে ‘দীপু নাম্বার টু’ প্রথম কাতারে থাকবে এটুকু নিশ্চিত। ছেলেবেলার সাইকোলজি যেদিকে যায় বা পরিবার, নিজের অালাদা ভুবন, আবিষ্কারের নেশা এসব স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হিশেবেই থাকে।লেখক মুহাম্মদ জাফর ইকবাল সূক্ষ্মভাবে সে প্লটকে তাঁর উপন্যাসে কাজে লাগিয়েছেন। আর উপন্যাস থেকে সিনেমা বানিয়ে বিরল মুন্সিয়ানার হাত দেখানো নির্মাতা হলেন মোরশেদুল ইসলাম। সিনেমাটি আমাদের ছেলেবেলার ইমোশনকে টাচ করতে পেরেছিল বলেই আজো দেখতে ভালো লাগে এবং আমরা নস্টালজিক হই। পাশাপাশি এ প্রজন্ম বা আগামী প্রজন্ম তাদের ছেলেবেলাকে ছুঁয়ে দিতে চাইলেও এ সিনেমার কাছে অনেককিছুই পাবে। অতঃপর, সময় এবং দর্শক ইমোশন ধারণ করার বিরল যোগ্যতা নিয়েই সিনেমাটি ক্লাসিক। বর্তমান লেখাটি পড়তে পড়তে অাপনার কাছে ‘ক্লাসিক’ দিকটি পরিষ্কার হবে। Continue reading

কেয়ামত থেকে কেয়ামত : পপুলার ও ক্লাসিক

ঢালিউডের সিনেমায় যে সিনেমাগুলো একটা বাঁক পরিবর্তনে অবদান রেখেছে এবং নতুন সময়ের সূচনা করেছে তাদের মধ্যে অন্যতম সেরা সিনেমা ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত।’ সিনেমাটি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শেষ থেকে যদি শুরু করা যায় তবে সেটা হবে উত্তম কাজ। গাজী মাজহারুল ইসলামের দরাজ কণ্ঠে বলা কথাগুলো -‘এই প্রেম অমর, অসীম। এই প্রেমের সীমানা কেয়ামত থেকে কেয়ামত।’ কথাগুলের মধ্যে লুকিয়ে অাছে ক্লাসিক দিকটি যা প্রেমের জন্য সব দেশকাল পাত্রে ঠিক। অাপনি অামি লাইলী-মজনু, শিরি-ফরহাদ, অানারকলি-সেলিম, রোমিও-জুলিয়েট তাঁদের উদাহরণ টানলে তারাও মানুষের হৃদয়ে অমর প্রেমের জন্য স্মরণীয়। প্রেমের জন্য জীবন উৎসর্গের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাই ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ একটি অাদর্শ প্রেমের সিনেমা। জীবন উৎসর্গ এ সিনেমার কেন্দ্র। Continue reading

যোদ্ধা : মাল্টিস্টারার ফুল প্যাকেজ কমার্শিয়াল

একটা সিনেমা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রথমেই তার অফিসিয়াল পোস্টার নিয়ে কথা বলতে হয়। অফিসিয়াল পোস্টার লঞ্চ করতে অাজকের ডিজিটাল ঢালিউডে অনেক পলিসি অাছে। শুধু পোস্টারই বা কেন! এখন টিজার, ট্রেলার অারো অনেক পলিসি অাছে। ৩৫ মিলিমিটারের সিনেমার সময় নিকট অতীতে ‘যোদ্ধা’ সিনেমার অফিসিয়াল পোস্টারে একটা বিশেষ বুদ্ধিদীপ্ত টেকনিক অ্যাপ্লাই করেছিলেন সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা পরিচালক শহীদুল ইসলাম খোকন। লাল অাবরণের পোস্টারের গায়ে লেখা ‘এটি একটি সিনেমার পোস্টার”। ‘যোদ্ধা’ নামটি লাল অক্ষরের এবং তার প্রতীকী অর্থ অাসে যুদ্ধ থেকে যোদ্ধা হতে হয় তাই রক্তের লাল রং একটা সূক্ষ্ম চিন্তা এখানে। সমাজ ও রাজনীতির সে যোদ্ধা লড়াকু নায়ক রুবেল। Continue reading

পূর্ণিমার অালোয়

বন্ধুমহলে পূর্ণিমাকে নিয়ে বাজি ধরেছিলাম। বাজিটা টিকে যাবে তা ভেবে বাজিটা ধরিনি কিন্তু।তারপরেও টিকে গেছে।বন্ধুদের সাথে গ্রামের খাড়ি নদীর পুলে বসে এক সন্ধ্যা তুমুল তর্ক হয়ে গেল সেবার। ১৯৯৮ সালের এক সন্ধ্যায় ‘এ জীবন তোমার আমার’ সিনেমাটি দেখে বন্ধুদের বললাম ‘মেয়েটা কী সুন্দরী দেখেছিস! এ মেয়ে অনেকদূর যাবে। ‘এই ‘অনেকদূর’ শব্দটাকে বন্ধুরা মানতে চাইল না।এক বন্ধু বলল ‘তুই বললেই হবে নাকিরে?’ বললাম ‘আমার মনটা বলে মেয়েটা অনেকদূর যাবে।’ Continue reading

মহানায়ক : প্লেবয় অ্যাডভেঞ্চার

একজন অালোকবর্তি নির্মাতা অালমগীর কবির। তাঁর চেতনার জায়গাটা তাঁর সময়ের থেকে কমপক্ষে পঞ্চাশ বছর এগিয়ে। তিনি ঢালিউডে গ্রাম-শহর জীবনের সাথে সেতুবন্ধ তৈরির একজন অাদর্শ সিনেমাযোদ্ধা। উঁচুতলার ও নিচুতলার মানুষের বিভেদ ঘুচিয়ে দিয়েছেন তাঁর সিনেমার ভাষায়। অামাদের অাকিরা কুরোসাওয়া, অাব্বাস কিয়ারোস্তমি না থাকলেও চেতনার জাগরণ ঘটানোর ক্ষেত্রে যে নির্মাতারা অবদান রেখেছেন তাঁদের মধ্যে অালমগীর কবির প্রথম কাতারের। অাশ্চর্য হলেও সত্য তাঁর মতো লিজেন্ড নির্মাতাকে দৃষ্কৃতিকারীরা অারিচা ঘাটে পেছন থেকে ধাক্কা মেরে পানিতে ফেলে দিয়ে মেরে ফেলে। তাঁর অারিচা ঘাটে পৌঁছানোর খবর দৃষ্কৃতিকারীদের কাছে অাগেই পৌঁছে গিয়েছিল। অামাদের বুদ্ধিবৃত্তিক পাপের একটা অংশ অন্ধকারে নিমজ্জিত থেকেছে এ নির্মাতাকে বাঁচতে না দেয়া। যে অন্ধকারে বাঙালি জাগরণ থমকে গেছে জহির রায়হানের মতো মাস্টার অার্টিস্টকে হারিয়ে।নিঃসঙ্গতার পথে এগিয়ে গেছি অামরা।

বুলবুল অাহমেদ ঢালিউডের জেন্টেলম্যান অ্যাক্টর। তাঁর অভিনয়, ব্যক্তিত্ব, স্টারডম এসবে একটা ক্লাসিক বৈশিষ্ট্য ছিল। তিনি সিনেমা অল্প করেছেন। যা করেছেন বেছে বেছে করেছেন। তাঁর চরিত্রের গুরুত্ব দেখে কাজ করেছেন। তাঁর সাথে অালমগীর কবিরের সংযোগ ঘটেছিল ব্যাটেবলে তাই এই দুই নির্মাতা ও শিল্পী মিলে অাদর্শ শিল্প নির্মিত হয়েছে। ‘সূর্যকন্যা, সীমানা পেরিয়ে’ এ ধরনের ওয়ার্ল্ড ক্লাস সিনেমার ধারাবাহিকতায় নির্মিত হয় ‘মহানায়ক’ নামের অার একটি মাস্টারপিস ক্লাসিক সিনেমা। এ সিনেমা একবার দেখলে অার একবার দেখতে ইচ্ছে করে। একজন প্লেবয়কে শুধুই প্লেবয় হিশেবে অালমগীর কবির দেখাননি। এর পাশাপাশি অন্যায়ের সাথে মানুষের বিবেককে জাগানোর কাজও করেছেন।

গলি থেকে রাজপথ, রাজপথ থেকে ফাইভ স্টার হোটেল সব জায়গায় পৌঁছে যায় বুলবুল অাহমেদ। কাজ তাঁর প্রতারণা। প্রতারণার প্রধান অস্ত্র প্রেম তার সাথে মানুষের সাথে মিশে পারিবারিক ও অাত্মিক সম্পর্ক তৈরি করা। শুরুটা হয়েছিল দিলদারকে দিয়ে। পকেট মারতে সেন্ট্রাল শপের বাইরে বুলবুল অাহমেদকে দাঁড় করায় দিলদার। বুঝিয়ে দেয় তাঁকে-‘কেউ যদি অামাকে ধরার জন্য দৌড় দেয় অাপনি অামাকে চেনেন না।’ তারপর গাড়িতে উঠতে গিয়ে একজন লোকের মানিব্যাগ পড়ে যায়। সেটা ফেরত দিতে পেছন থেকে যাক দেন বুলবুল অাহমেদ। দিলদার সে যাত্রায় পাবলিকের কাছ থেকে তাঁকে সেভ করে পাগলের পরিচয় দিয়ে। বুলবুল অাহমেদ মানিব্যাগটা ফেরত দিতে চাইলে দিলদার কৌতুক করে-‘অাল্লাহ অাপনার জন্য রহমত পাঠাইছে অার অাপনি ফেরত দিবেন?অাল্লাহ নারাজ হবেন না!’ ইমোশনাল পার্টকে এখানেই শুধু না পুরো সিনেমায় ব্যবহার করেছেন পরিচালক। বুলবুল অাহমেদ ভাগ্যক্রমে নতুন পার্টি পান। অাহমেদ শরীফ তার উপরে ওঠার সিঁড়ি করে দেন। প্রতারণা পর্বের অভিজাত পর্ব শুরু হয়। অভিজাত বলছি কারণ প্রতারণা করতে গিয়ে বুলবুল অাহমেদের গেটঅাপ পরিবর্তন হতে থাকে রাজসিকভাবে।গোঁফছাড়া, গোঁফযুক্ত, স্যুট-টাই পরা পারফেক্ট জেন্টেলম্যান তখন। পর্যটক হয়ে নেপাল, বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) শ্রীলংকা ঘোরার সাথে প্রেমের ফাঁদে ফেলার কাজটাও তার সাথে করে ফেলে। সুবর্ণা পোখরেলকে বশ করে। বলা হয় প্রথম প্রেম ভোলা যায় না। সুবর্ণা পোখরেল বুলবুলকে মন থেকে ভালোবেসেছিল তাই প্রথম প্রেমের কাছেই তাকে ফিরে অাসতে হয়েছিল সবকিছুর পরে। হৈমন্তী শুক্লার কণ্ঠে ‘তুমি চাও প্রিয় নদী হয়ে’ গানটি এ জুটির অন্যতম সুন্দর রোমান্টিক গান। সেখানে অাহমেদ শরীফের বনিবনা হয় না।সমস্যা বাঁধে এবং কেরামত মওলা ঘটনাক্রমে মারা যায়।নেপালে অাসার পর যে মেয়েটির সাথে ঘোরাফেরা করে বুলবুল অাহমেদ সে মেয়েটিও তাঁকে ভালোবেসে ফেলে। কিন্তু বু্লবুল অাহমেদ জানেন প্রতারণাই তার শেষ সম্বল। ‘অামার এ দুটি চোখ পাথর তো নয়’ এ গানটি তাঁর অন্তর্দহনের কথা বলে। নেপাল ছাড়ার সময় মেয়েটি বলে-‘তুমি অাসবে না অামাকে দেখতে?’বুলবুলের উত্তর-‘তোমার সাথে অার কোনোদিন দেখা হবে কিনা জানি না। তোমার চোখে দেখা এই হিমালয়কন্যা নেপালকে অামি কোনোদিন ভুলব না।’ এটা একইসাথে বুলবুল অাহমেদের বিবেকবোধ অাবার ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল দুটোকেই দেখায়। পরের মক্কেল কাজরী। কাজরীর পরিবার বিশেষ করে তার বাবা শওকত অাকবর বুলবুলকে গ্রহণ করে দারুণভাবে।যেহেতু অভিজাত পরিবার তাই বাড়ি, গাড়ি এসবের কথা বলে ম্যানেজ করে। কাজরী বুলবুলকে ভালোবেসে ফেলে তাঁর স্মার্টনেসের কারণে।কাউকে ভালোবাসে কিনা জানতে চাইলে ‘হাজার মনের কাছে প্রশ্ন রেখে’ গান ধরে। এ সিনেমার অন্যতম সেরা গান এটি। কাজরীকে বিয়ের প্রস্তাবটা নিজে থেকেই দেন বুলবুল অাহমেদ। অনাথ, এতিম বলে পরিচিতি দেয়া বুলবুল কাজরীর মা-বাবার কাছে ততদিনে মন থেকে জায়গা করেছে। শওকত অাকবরের কাছে ক্যাশ টাকা কৌশলে নেবার পর প্রতারণা করে। সে যাত্রায়ও সফল হয়। দেশে ফিরে পুলিশি অ্যাকশনে বাচ্চা কিডন্যাপ করেন বুলবুল অাহমেদ। সুবর্ণা পোখরেলকে পুলিশ কাজে লাগিয়ে মধ্যস্থতা করে। জেল থেকে বেরিয়ে সু্বর্ণার সাথেই মিল হয়। প্রথম প্রেমই হয় শেষ অাশ্রয়।

অালমগীর কবির নিজের ক্রিয়েটিভিটির জায়গাগুলোকে তীক্ষ্ণ করে দেখান সিনেমায়। বুলবুল অাহমেদকে স্টাইলিশ প্লেবয় হিশেবে তুলে ধরেন। বুলবুলের চরিত্রটি এতই রাজসিক যে তার প্রেমে অনায়াসে পড়ে গিয়েছিল নায়িকারা, তিনি অাগে পড়েননি। পার্টনার অাহসান অালির সাথে মিলে প্রতারণার পর্বগুলোর শেষপর্বে এসে শওকত অাকবরের সই জালিয়াতি করার সময় বুলবুল অাহমেদ তাকে বলেন-‘এ লাইনে আপনাকে গুরু মানলাম। সই জালিয়াতে অাপনাকে মেডেল দেয়া উচিত। ‘অাহসান অালির জবাব দারুণ- “অামাকে সই জালিয়াত বললেন! মনে বড় দুঃখ পেলাম। আমি কিন্তু নিজেকে একজন ‘signature artist’ মনে করি।” বুলবুল অাহমেদের পাল্টা কাউন্টারটা অারো জোস-“অামিও কিন্তু নিজেকে একজন বড় ‘pocket scientist’ বলে মনে করি।” প্রতারণাকে অার্টের পর্যায়ে নিয়ে একটা অালাদা মাত্রা যোগ করেছেন পরিচালক। বুলবুল অাহমেদ কাজরীকে দেবার জন্য একটা চিঠি পোস্ট করতে বলে অাহসান অালিকে। তখন অাহসান অালি বলে-‘অামাদের মতো অার্টিস্টদের জন্য প্রেম জিনিসটা হচ্ছে বিষ। ‘বুলবুল অাহমেদ বলেন-‘প্রেমের থেকেও দুর্ধর্ষ বিষ হচ্ছে বিবেক সে অাপনি বুঝবেন না।’ এখানে এসেই বুলবুল অাহমেদের ক্যারেক্টারাইজেশন চূড়ান্ত মেসেজটা দেয় সেটা হলো প্লেবয়রাও পরিস্থিতির শিকার হয়ে কাজ করে এবং বিবেক তাদেরও অাছে। সিনেমার কাজ শুধুই বিনোদন নয় মানবিক বোধ জাগানো বা দেখানোও তার কাজ। অালমগীর কবির সেটা দেখিয়েছেন। সিনেমাটিতে প্রেম, প্রতারণা, বিবেববোধ সব মিলিয়েই পূর্ণাঙ্গ চরিত্রের মহানায়ক বুলবুল অাহমেদ।

একজন বু্লবুল অাহমেদের চুজি ক্যারেক্টারের সিনেমা বাছাই অার স্টাইলিশ অভিনয়কে কেন্দ্র করে তাঁকে ঢালিউডে যতটা স্পেস দেয়া উচিত ছিল ততটা দেয়া হয়নি। বুলবুল অাহমেদকে নিয়ে দর্শকের অাক্ষেপের জায়গা এটাই। তারপরেও তাঁর যে সিনেমাগুলো অাছে সেগুলো দেখা ও অালাপ-অালোচনা চালু রাখার কাজটা করলে বুলবুল অাহমেদের বিশেষত্ব পৌঁছে যাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

বিশ্বপ্রেমিক : মাস্টারপিস কমার্শিয়াল এক্সপেরিমেন্ট

বিশ্বপ্রেমিক ছবির পোস্টার

‘I will do anything for love
I’ll never lie to you and that’s a fact’.
– Meat Loaf

ভালোবাসার জন্য সবকিছু করতে পারি অামি। এ মন্ত্র থেকে ভালোবাসা অার ভালোবাসার মানুষকে পেতে সবকিছু করতে রাজি এমন প্রেমিকের সিনেমা বিশ্বপ্রেমিক সিনেমার ট্যাগলাইনে meat loaf এর গানের প্রথম লাইন ব্যবহৃত হয়েছে। বিশ্বে প্রেমিক অনেক অাছে, সবাইকে অামরা চিনি না।নিজেদের দেখার মধ্যে অামরা যাদেরকে চিনতে পারি, জানতে পারি তাদের বৈশিষ্ট্য চেনা পরিচিতই লাগে। পরিচিত, অপরিচিত সব প্রেমিকই প্রেম পিয়াসী। সবাই প্রিয় মানুষের জন্য যার যার জায়গায় বিশ্বপ্রেমিক।

কলেজ জীবনে এক ছেলেকে দেখেছিলাম একটা মেয়ের জন্য হাত কেটেছিল। দরদর করে রক্ত ঝরে তার লাল হয়ে যাচ্ছিল মাটি কিন্তু সে এতটুকু অাহ, উহ শব্দ পর্যন্ত করছিল না। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে নিজের বিভাগের বড়ভাই সবুজের কথা শুনেছিলাম। সবুজ ভাই একদিন গো ধরলেন যে ডায়না অাপুকে অাজ বলতেই হবে উনি তাকে ভালোবাসেন কিনা। ছুটির পরেও বিভাগের ক্লাসরুমে ছিল সবুজ ভাই। সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছিল তাও হলে যাবার নাম নেই। পরে স্যার বিষয়টা জানার পর ডায়না অাপুকে ডাকা হয়। ডায়না অাপু সব জেনে তার পারিবারিক সমস্যার কথা বলে। স্যার অাপুর মা-বাবার সাথে ফোনে কথা বলেন। তারা বলেন-‘স্যার, অাপনি যা ভালো মনে করেন তাই করুন। ‘স্যার ডায়না অাপুকে বললেন-‘ডায়না, তুমি সবুজের সাথে বন্ধুর মতোই থাকো।কথা বলো। পরে যদি তোমার ভালো লাগে তাকে সেটা তখন ভেবে দেখো। ‘ডায়না অাপুকে পরদিনই সবুজ ভাইয়ের সাথে রিকশায় ঘুরতে দেখা গেছে। প্রেমিকের কান্ডের কী অার শেষ অাছে! এরকম অনেক জানা-অজানা প্রেমিক মিলিয়ে প্রেমের অালাদা জগৎ রচনা করেই যে যার মতো বিশ্বপ্রেমিক হয়ে গেছে।

শহীদুল ইসলাম খোকন তাহলে একটা নিপাট রোমান্টিক সিনেমা বানিয়েছেন এমনটা ভাববেন যারা অাজও সিনেমাটি দেখেনি। যারা দেখেছে তাদের কথা ভিন্ন। কারণ, তারা একে শুধুই রোমান্টিক সিনেমা বলবে না।রোমাঞ্চের মধ্যে খোকনসাহেব মিশিয়ে দিয়েছেন দুর্দান্ত সাইকোপ্যাথ থ্রিলারের অামেজ। এ অামেজকে ব্যবহার করতে তাঁর দাবার গুটি মাস্টার অার্টিস্ট হুমায়ুন ফরীদি। সাইকোপ্যাথ কিলার অনেক দেখা যায় যাকে বাস্তবে ও সিনেমায় সিরিয়াল কিলাররূপে মেলে। বাংলাদেশে এরশাদ শিকদারের বর্বর সিরিয়াল কিলিং কিংবা নিকট অতীতে নসুর ঘটনাও স্মরণযোগ্য। নসু মেয়েদের ধর্ষণ করত তারপর হত্যা করত। বিশ্বপ্রেমিক সিনেমায় হুমায়ুন ফরীদি সাইকোলজির দিক থেকে হতাশ এক লোক। যার হতাশা তৈরির কারণ হিশেবে তার মা অন্যতম প্রধান কারণ। তার মা তার বাবাকে হুইল চেয়ার থেকে ফেলে দিয়ে মেরেছিল। মাকে তাই শত্রু ভাবে। তার অারো বড় শত্রু অাছে। এখানে পরিচালক খোকন ফরীদিকে দিয়ে একটা এক্সপেরিমেন্ট করেন। সাইকোপ্যাথ কিলিং এ একটা সূক্ষ্ম উপাদান দিয়ে দেন সেটা হচ্ছে মেয়েদের গলার নিচে ‘তিল।’ ফরীদি বলে-‘ঐ তিল থাকা ভালো না। ওতে মেয়েরা নষ্ট হয়ে যায়। ওটা কেটে ফেলতে হয় নইলে পুরুষরা বারবার ঐ তিলের দিকে তাকাবে অার তোমার প্রতি কামবাসনায় পড়বে। ‘বৈজ্ঞানিক দিক থেকে কামবাসনাকে ফ্রয়েডীয় ভাষায় ‘eros’ বলে। এর জন্য নারী-পুরুষের অাকর্ষণ হয় পরস্পরের প্রতি। মূলত পুরুষ নারীর প্রতি অাকর্ষিত হয় বেশি এবং তা নারীর সৌন্দর্যের জন্য। সৌন্দর্যের একটা উপাদান সিনেমায় ‘তিল’-কে দেখানো হয়েছে অার ফরীদি সেটার জন্যই মেয়েদের ধরে অানে তিল কেটে নেবার জন্য। মেয়েরা বাধা দিলে খুন করে তিল কেটে নেয় তারপর জমায়। এই স্টোরি টেলিংকে যদি কেউ উদ্ভট ভাবে তবে সেটা ভুল হবে অাবার ঠিকও হবে। কারণ উদ্ভট বা ‘absurdity’ সাইকোপ্যাথের বিষয়। উদ্ভট অাচরণ সাইকোলজির সমস্যা থেকেই অাসে। এই সাইকোপ্যাথ থ্রিলিং খোকন সাহসীভাবে করেছেন যার পেছনে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা অাছে। কমার্শিয়াল এক্সপেরিমেন্টে খোকন সেদিক থেকে তাঁর সময়ের থেকে অাধুনিক ছিলেন।

হুমায়ুন ফরীদি কলেজের বড়ভাই। টিচারকে সালাম দিলে টিচারই উল্টো লজ্জিত হয়ে বলে-‘কেন লজ্জা দিচ্ছেন বড়ভাই। অাপনি অামার দু’বছরের সিনিয়র ছিলেন। ‘এসময় ফরীদি বলে-‘ছোকরার স্মরণশক্তি অাছে’। নির্মল কমেডির কাজটাও ফরীদি করেছেন।রোমান্টিক অাবহটা রুবেল মৌসুমীকে দেখার পর শুরু হয়। প্রেমের প্রস্তাব দিলে ফিরিয়ে দেয়। রুবেল হাল ছাড়ে না। কলেজ ক্যাম্পাসে, টেলিফোনে বিরক্ত করতেই থাকে।ড্রাইভার সাজে। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিশেবে ভেসে অাসে ‘i will do anything for love’ গানের লাইন”। মৌসুমীর মন গলে না উল্টো রুবেলকে শায়েস্তা করতে গুণ্ডা ভাড়া করে কিন্তু কাজ হয় না মার্শাল অার্টের দক্ষ নায়কের কাছে। রুবেলের ব্রেইন টিউমারের খবরটা মৌসুমীকে দেয় সোহেল রানা। ছয় মাস অার বাঁচবে শুনে মৌসুমীর মন গলে। তারপর প্রেম এবং বিয়ে।

সিনেমায় রোমাঞ্চ ও থ্রিলারের মাঝে সংযোগটা অানতে শহীদুল ইসলাম খোকন হুমায়ুন ফরীদিকে রাখেন ট্রাম্পকার্ড হিশেবে। ফরীদিকে মৌসুমী মিথ্যে করে বলে যে তাকে বিয়ে করবে, তার বাবার সাথে দেখা করতে। মিষ্টি নিয়ে বাসায় হাজির হয়ে নিজেকে পাত্র পরিচয় দেয়। মৌসুমীর বাবা খলিল মেজাজ করে অার মৌসুমী শুনে হাসিতে লুটোপুটি খায়। ফরীদির শত্রুতা তখন রুবেলের সাথে কারণ মৌসুমীর প্রেমিক অার রুবেল বাঁচবে অল্পদিন সেটা প্লাস পয়েন্ট তার জন্য। এর মধ্যে ফরীদি নিজের চাকর বাবর শেঠের বউকে খুন করে তিল থাকার কারণে।রুবেলের অপারেশনের সময় মৌসুমীর গলার নিচে তিল দেখতে পায় ফরীদি।অতঃপর ফাইনাল টার্গেট মৌসুমী।ঘরে অাটকে রেখে তিল কাটতে চায়। ফরীদির মা মৌসুমীকে ছেড়ে দিলে মাকে খুন করে। মাকে খুন করার মাধ্যমে সাইকোপ্যাথের কিলিং মিশনে চূড়ান্ত দিকটা ধরা পড়ে যে এরা যে কাউকে খুন করতে পারে। মৌসুমীকে খুনের চেষ্টা করলেও সোহেল রানা সবাইকে জানায় ফরীদি মানসিক রোগী। রুবেল উদ্ধার করে মৌসুমীকে অার ফরীদি অাত্মহত্যা করে।সাইকোপ্যাথরা নিজেকে শেষ করে নতুবা অন্যকে।

এ সিনেমার শক্তিশালী প্রেজেন্টেশন হলো ভিলেনকে নায়কের চেয়ে প্রেজেন্টেবল করা এবং খোকনসাহেব তা পেরেছেন। হুমায়ুন ফরীদিকে দিয়ে তাঁর কমার্শিয়াল সিনেমার অন্যতম সেরা অভিনয় অাদায় করে নিয়েছেন। তিল কাটার সময় ফরীদি যেমন নৃশংস অাবার মৌসুমীর বিয়ের প্রস্তাব পেয়ে ততটাই রোমান্টিক। রোমাঞ্চে ডুবে গাওয়া বিখ্যাত সেই গান ‘তোমরা কাউকে বোলো না’ একটা মাইলফলক গড়েছে বাংলাদেশের টোটাল সিনেমায়।এরকম গান অার একটাও নেই। গানে ফরীদির ঘাড় পর্যন্ত লাল চুল, মনোহর নাচ অার অসম্ভব সুন্দর সব রোমান্টিক এক্সপ্রেশন মুগ্ধ করে।মুগ্ধ করে তার কো-অার্টিস্ট মৌসুমীর অনবদ্য কস্টিউম, গ্ল্যামার অার স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয়। গ্রেট প্রেডাক্ট তৈরিতে এ গানে ভিলেন-নায়িকার ব্যতিক্রমী কেমিস্ট্রি সিনেমাটিকে অনেকদূর এগিয়ে দিয়েছে এবং অাজ পর্যন্ত স্মরণীয় করেছে। মৌসুমী-রুবেলের খুনসুটি জমজমাট ছিল। প্রেম ও বিয়ের পর রুবেল একদিন অনেক রাতে জেগে থাকা মৌসুমীকে শুয়ে পড়তে বলে।মৌসুমী বলে -‘তুমি ঘুমাবে না?’ রুবেল বলে-‘অামি তো গভীর ঘুমে তলিয়ে যাব।’ মৌসুমী চমকে ওঠে। এভাবে স্যাড ভার্সনের পার্টও সিনেমায় বড় ভূমিকা রেখেছে।ফরীদি, রুবেল ও সহশিল্পীদের পারফর্ম করা ‘এ কী কথা শুনাইলি রে’ গানটি এনজয়অ্যাবল। এছাড়া ‘শিখা অামার শিখা’ অসাধারণ অার একটা রোমান্টিক গান। মৌসুমী হেলিকপ্টারে করে রুবেলকে প্রপোজ করতে অাসার সিকোয়েন্সটি দুর্দান্ত। পরিচালক রোমাঞ্চ, সাইকো থ্রিলিং এবং কমার্শিয়াল সিনেমার অন্য সব দিক ব্যালেন্স করে সিনেমাটিকে ওভারঅল উপভোগ্য করেছেন। স্পেশালিটি থেকে এক্সপেরিমেন্টের বিষয়গুলো উপভোগ্য ফুল প্যাকেজ করেছে এবং সেভাবেই বিশ্বপ্রেমিক কমার্শিয়াল মাস্টারপিস।

বিশ্বপ্রেমিক মনে মনে সবাই।সবাই চায় প্রিয়জন ভালো থাকুক। তাই বলা কর্তব্য ‘পৃথিবীর যাবতীয় প্রেমিক-প্রেমিকারা ভালো থাকুক।’

পোস্টার কৃতজ্ঞতা :
সানোয়ার সানু ও মোঃ সাইফু্ল

মরণের পরে : যে সিনেমা দেখা কর্তব্য

মরনের পরে সিনেমা রিভিউএকজন নির্মাতা ও অভিনেতা অাজহারুল ইসলাম খান-কে অামরা অনেকেই চিনি। বলা ভালো তাঁকে দেখতে দেখতে অভ্যস্ত। আদালতের জজ সাহেব বা পুলিশের বড়কর্তা হিশেবে প্রায়ই চোখে পড়ে তাঁকে। সেই অভিনেতা যে এক সিনেমাতেই ঢালিউডে অালাদা একটা ইতিহাস করে ফেলবেন তা কে জানত! তিনি নির্মাণ করলেন সাড়া জাগানো সিনেমা ‘মরণের পরে।’

Continue reading

পাগলা বাবুল : যে সিনেমা অাজও অপরিহার্য

পাগলা বাবুল ছবির পোস্টারদেশটা কেমন চলছে?

সরকার দলীয়রা বলবে-‘খুব ভালো চলছে। বিরোধী দল বলবে-‘অামাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে। সাধারণ জনগণ যা বলতে চায় সেটা বলতে পারবে না। জনগণ সবচেয়ে অসহায়, তাদের কাজ দেশে যাই হোক শুধু দেখে যেতে হবে।

কাজী হায়াৎ তাঁর বাণিজ্যিক সিনেমা নির্মাণের ক্যারিয়ারকে সমৃদ্ধ করেছেন রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়ার মাধ্যমে। তাঁর এ সিনেমাগুলো ছিল প্রতিবাদের ভাষা। সে ভাষার প্লট থাকত সমাজের চলমান নানা সমস্যা যার মধ্যে রাজনীতি প্রধান উপাদান। Continue reading

ছুঁয়ে দিলে মন : মন ছোঁয়া শিল্প

মন ছুঁয়ে যেতে কী লাগে… খুব বেশি কিছু লাগে না। আপনার প্রিয়তম বা প্রেয়সীর সামনে একগোছা ফুল হাতে দাঁড়িয়ে যান তার মন ছুঁয়ে যাবে কেননা আপনি তাকে ভালোবাসেন, সে আপনাকে ভালোবাসে… হয়তো সে আপনাকে ভালোবাসার আবেগে জড়িয়ে বলবে (ভালোবাসি).. মন ছুঁয়ে যেতে ওটুকুই যথেষ্ট।

যে কোনো শিল্পকে মানুষের মন ছুঁয়ে যাবার একটা গভীর কাজ ভেতরে ভেতরে করে যেতে হয়। শিল্পী যেভাবে ছবি আঁকে,ভাস্কর যেভাবে ভাস্কর্য বানায়, কণ্ঠশিল্পী যেভাবে গান গায় এদের সবার মধ্যে একটা গভীর চেতনা ও সাধনা কাজ করে যাতে তারা মানুষের মনকে ছুঁযে যেতে পারে। এমন এক সাধনা সিনেমার শিল্পী পরিচালকেরও থাকে যাতে তাঁর সিনেমা দেখে মানুষ বলে (ছুঁয়ে দিলে মন)… এমনই এক প্রেমের গল্প নিয়ে পরিচালক শিহাব শাহীনের এবছরের আলোচিত নতুন সিনেমা.. (ছুঁয়ে দিলে মন)… সিনেমায় কী আছে যার জন্য আমরা বলতে পারি মন ছুঁয়ে গেছে বা যারা এখনো সিনেমাটি দ্যাখেননি তাদের জন্য কী বলতে পারি যাতে তারাও ভাবতে পারে (ছুঁয়ে যাবে মন)… দুটোরই একটা খসড়া করা যাক এবার…. Continue reading